আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমূল্যায়ণ

By Tasnim Tarannum   (১) গত রামাদানে হুট করে আমার ছোট বোন যখন বলল, আপু আমি এখন থেকে হিজাব পরব

13---attobishshash

By Tasnim Tarannum

 

(১)

গত রামাদানে হুট করে আমার ছোট বোন যখন বলল, আপু আমি এখন থেকে হিজাব পরব…আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম।
.
না, হিজাব পরার তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে অবাক হইনি। পরম করুণাময়ের অশেষ করুণাতে, কঠিনতম পাথরও মুহূর্তে মোমের মত গলে যেতে সক্ষম। মানুষের মনের গতিপথ বদলে দেওয়া তো তাঁর জন্য কিছুই নয়! তাই পিচ্চিকে মানাবে, এমন করে হিজাব পরিয়ে দিলাম। চোখে মুখে তার সে কি খুশি!
.
প্রথম যেদিন সে বাইরে যাবে হিজাব পরে, আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিল, “আপু, সবাই যদি হাসে?”
.
“সবাই হাসবে কেন?”
.
“না, আগে কখনো পরিনি তো। আর এখনো তো একদম পারফেক্টভাবে পরতে পারিনা।”
.
সাহস দিলাম, উৎসাহ জোগানোর চেষ্টা করলাম। সত্যি কেউ হাসেনি, বরং উৎসাহ দিয়েছিল!
.
কিন্তু দুইদিন পর আমাকে আবার জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা আপু, আমাকে কি খুব পচা লাগে হিজাব পরলে?”
.
কি বলব বুঝতে পারছিলাম না, তার বয়স এবং ম্যাচুরিটি লেভেল এর কথা চিন্তা করলে এই ধরনের চিন্তা আসা খুব কঠিন কিছুনা।

.
(২)

একদিন পিচ্চির আত্মোপলব্ধি, “আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা, মাঝে মাঝে মনে হয় আমার জন্ম না হলেই ভালো হত। সবাই শান্তিতে থাকত।”
.
এই ধরনের কথাবার্তা একজনের মানসিক শান্তির জন্যই শুধু ক্ষতিকারক না, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করার মত কঠিন পাপের শামিল! কিন্তু হতাশায় জর্জরিত মানুষগুলো খুব সহজেই সাধারণ সত্যিগুলো ভুলে যেতে পারে…
.
তাই পরীক্ষার রেজাল্টের পর হুট করে এ কথা শুনে অবাক হইনি… যতটুকু পারলাম সান্ত্বনা দিলাম। কিন্তু বেশ কয়েকদিন ধরে এর পুনরাবৃত্তি শুনে চিন্তায় না পড়ে পারলাম না…
.
কেন এত self esteem আর self confidence এর অভাব আমাদের?
.
.
চারিদিকে বস্তুগত চিন্তাভাবনার ছড়াছড়ি, সবাই ছুটছে একে অন্যের থেকে নিজেকে ভালো প্রমাণের চেষ্টায়… বস্তুগত ব্যাপারে চলছে নিরন্তর প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে যে মেয়েটি হিজাব পালন করতে চায়,তথাকথিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে অস্বীকার করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়,  নিজেকে সংযত রাখতে চায়, কিংবা যে ছেলেটি দাড়ি রাখছে, হারাম অনেক কিছু থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে.. বাইরের পরিবেশের চাপে ক্ষণিকের জন্য হলেও তাদের মনে হয়ত হতাশা জেগে উঠতে পারে। বস্তুগত প্রতিযোগিতায় এই স্বেচ্ছায় পিছিয়ে পরা সবার জন্য খুব সুখকর নাও হতে পারে… পথটা প্রত্যাশার মত মসৃণ নাও মনে হতে পারে! তখন আমাদের কি করা উচিত?
.
বিশেষ করে যারা নতুন নতুন ইসলামকে চিনতে শিখছে, অথবা জাহেলিয়াতের এই যুগে দ্বীনকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, শয়তানের প্ররোচনায় তাদের মধ্যে এই হতাশাবোধ কিছুটা হলেও জেগে ওঠে।
.
অনেকের হয়ত এমনি এমনি মনে হয়, “ইশ! এই দুনিয়াতে আমি না আসলে এমন কি ক্ষতি হত? অন্তত এত কষ্টের মধ্যে পরতে হত না। দুনিয়াতে আমি থেকেই বা কি লাভ হচ্ছে?”
.
এ দুই ধরনের চিন্তার পেছনেই একটা কারণ- আমরা নিজেকে মূল্য দিতে শিখিনা। পারিপার্শ্বিক চিন্তা দিয়ে খুব বেশি প্রভাবিত হয়ে, নিজের আসল যোগ্যতা ভুলে যাই… নিজেকে ভালবাসতে ভুলে যাই। অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ি, আর নিজের প্রতি ঘৃণা জমাতে থাকি অল্প অল্প করে। কি বিষাক্ত এই চিন্তাভাবনা!
.
Self esteem বলতে এটাই বোঝায়, আমরা নিজেদেরকে কতটুকু মূল্য দিতে শিখছি, নিজের সম্পর্কে আমরা কি ভাবি।
.
আপনি কিভাবে বুঝবেন যে আপনি self esteem এর অভাবে ভুগছেন?

  • নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়, আপাতদৃষ্টিতে কোন খারাপ কিছু ঘটলেই ( এমনকি যা আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই) নিজের ভাগ্য এবং জীবনকে দোষারোপ করতে থাকেন।
  • অন্যকে সবসময় নিজের চেয়ে উত্তম মনে হয়। “অমুকের তো এটা আছে, আমার নেই।” ,” অমুকের মত হলেই আমি সুখী হতাম”, এই ধরনের চিন্তা প্রতিনিয়ত মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।
  • সচরাচর নিজের কোন ভালো দিক চোখে পরেনা, নিজেকে বিশেষ কিছু মনে হয়না।
  • অন্যেরা কি বলছে সেটা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামান। অনেক হিজাবি মেয়েরা হিজাব ছেড়ে দেন, নিজেকে কুৎসিত দেখাচ্ছে এই ভেবে!
  • নিজেকে সকলের কাছে বোঝা মনে হতে থাকে।
.
নিজেকে জানুন

মানুষকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আপনি তার ব্যতিক্রম, এটা মনে করার কোন কারণ নেই। প্রতিটা মানুষ তার নিজ নিজ দিক থেকে অনন্য। প্রত্যেকেই আলাদা যোগ্যতা রাখে নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য, এমনকি ইসলামের জন্যও কিছু অবদান রাখার। সত্যি কথা বলতে আপনি যদি নিজের মধ্যে এমন কিছু না দেখতে পেয়ে থাকেন, হয়ত আপনি ভালো করে চিন্তা করে দেখেননি!
.
“বিশেষ যোগ্যতা” বলতেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে- ভালো চাকরি, সিজিপিএ ইত্যাদি। তাই চোখ থেকে বস্তুগত ভাবনার চশমাটা খুলে দেখুন! হয়ত আপনার অন্যকে ভালোবাসার অসীম ক্ষমতা রয়েছে, অন্যকে বোঝার এবং অন্যের হয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন। হয়ত আপনি খুব সুন্দর কুরআন পড়তে পারেন এবং মনে রাখতে পারেন। হয়ত আপনি মানুষকে সহজেই ক্ষমা করে দিতে জানেন, তাদের ছোটখাট দোষগুলো ঢেকে রাখতে জানেন। হয়ত আপনার সবকিছু গুছিয়ে রাখার সুন্দর অভ্যাস রয়েছে। হয়ত আপনি পশুপাখি খুব ভালোবাসেন, তাদের যত্ন নেন।
.
নিজের এমন একটা দিক খুঁজে বের করুন, যার জন্য আপনি নিজেকে শ্রদ্ধা করতে এবং ভালবাসতে পারবেন।
.
যদি নিজে কিছু বের করতে বা পারেন, কোন ভালো বন্ধু অথবা পরিবারের কাউকে জিজ্ঞেস করুন। আমার মনে আছে, হলিক্রসে থাকার সময় আমি ক্লাসের সবচেয়ে চুপচাপ মেয়ে ছিলাম। কিন্তু র‍্যাগ ডেতে ক্লাসের মেয়েদেরকে যখন ভয়ে ভয়ে নিজের ডায়েরী এগিয়ে দিলাম কিছু লিখার জন্য, নিশ্চিত ছিলাম কেউ কিছুই লিখবেনা! কিন্তু সেই ডায়েরী পড়ে আজো নিজের অজান্তে মুখে হাসি চলে আসে। হয়ত কিছুটা অতিরঞ্জিত, কিন্তু অন্যেরা আপনার এমন অনেক ভালো দিক গোপনে ভালোবাসে, যা হয়ত আপনি নিজেও জানেন না। আর, কেউ প্রশংসা করলে নিজেকে এর অনুপযুক্ত মনে করবেন না কিংবা অস্বীকার করবেন না! অহংকারে ডুবে যাবেন না অবশ্যই, কিন্তু তাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না।
.
এইটুকু আমাদের মনে রাখতেই হবে, আমরা কেউই ১০০% না। সকলেরই কিছু শক্তি আর কিছু দুর্বলতা রয়েছে। নিজের শক্তিগুলোর জন্য নিজেকে ভালোবাসুন, দুর্বলতাগুলোকে গ্রহণ করে নিজেকে আরো ভালো করার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে নিজের ভালো দিকগুলোর একটা তালিকা তৈরি করুন এবং প্রতিদিন সেটা দেখুন।

.
.

ঈমানকে উন্নত করুন

Imperfect এই সমাজ আর সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত সাফল্য আর সৌন্দর্যের নিত্যনতুন সংজ্ঞা দাঁড় করাবে আমাদের সামনে। অমুকভাবে নিজেকে না সাজালে অথবা অমুক জায়গায় পড়াশুনা না করলে আপনি খ্যাত… এমনটা অনেকে মুখে না বললেও হয়ত মনে মনে ভাবছে! যে কোন কিছু অন্ধভাবে অনুসরণ করার আগে চিন্তা করুন, আদৌ এটা প্রয়োজনীয় কিনা। নিজের ‘spiritual defense’ কে জাগ্রত না করলে আমরা প্রতিনিয়ত অন্যদের মত না হতে পারার মনকষ্টে ভুগতে থাকব।
.
আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা বহু আগেই আমাদের  উপর ‘perfect’ ইসলাম অর্পণের মাধ্যমে মর্যাদা দিয়েছেন, সৃষ্টির সেরা হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। বানিয়েছেন সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে। যে আপনার এই ব্যাপারগুলোতে আঙুল তুলে আপনাকে ছোট প্রমাণের চেষ্টা করছে, তাদেরকে সযত্নে অগ্রাহ্য করুন।
.
নিজেকে তুচ্ছ মনে করা থেকে মুক্তির সবচেয়ে ভালো উপায়- নিজের ঈমান কে পুনরুজ্জীবিত করা। সকল নেতিবাচক চিন্তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, তাঁর সাথে সম্পর্ক উন্নত করুন! তিনি কখনোই আপনাকে হতাশ করবেন না।
.
.

নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন

আমাদের বড় সমস্যা, নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে পারিনা। নতুন উদ্যমে কোন কিছু শুরু করার চেয়ে ঘরের কোণে বসে হা-হুতাশ করে দিন পার করে দেওয়া আমাদের কাছে সহজ মনে হয়।
.
কিন্তু সত্যি বলতে, আত্মবিশ্বাস এর মত সুন্দর জিনিস খুব কমই আছে! আত্মবিশ্বাস মানে এমন মনে করা না যে, আমি দুনিয়ার সেরা এবং সবাই আমার চেয়ে খারাপ! বরং আত্মবিশ্বাস হচ্ছে, মনে এই বিশ্বাস ধারণ করা- আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে কাজটি করতে পারবেন/ কোনকিছু অর্জন করতে পারবেন। হয়ত একদিনেই পারবেন না, কিন্তু আল্লাহ্‌র সাহায্যে সময়ের সাথে আপনি এগিয়ে যাবেন- এই বিশ্বাসটুকু রাখুন!
.
“আমি কিছু পারিনা/পারব না”, “আমাকে দিয়ে এটা হবেনা” … এই কথাগুলো আমরা প্রায়ই বলি যা আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে যথেষ্ট! বরং বলুন, “ইনশা’আল্লাহ আমি আমার চেষ্টা চালিয়ে যাব”, “ইনশা’আল্লাহ আমি পারব“ এই ছোট ছোট কথাগুলো শুধু আপনার না, আশেপাশের অনেক মানুষের মধ্যে নিজেকে বিশ্বাস করার প্রবণতা জাগিয়ে তুলবে।
.
আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আরেকটি ভালো উপায় হচ্ছে- আপনি ভালো পারেন অথবা আনন্দ পান, এমন কাজ বেশি বেশি করুন। সেটা যত সামান্যই মনে হোক না কেন!
.
.

অন্যের উপর নির্ভরতা কমান

আবার পিচ্চি বোনের কথায় ফিরে আসি। পিচ্চির অভিযোগ, “আমাদের ক্লাসের টিচারগুলো ভালো না, অমুক ক্লাসের টিচারগুলো বেশি ভালো। তাই এখন আমার আর পড়তে ইচ্ছা করেনা। পড়ে কি হবে?“
.
আসলেই কি তাই? আত্মবিশ্বাস মানে হচ্ছে, আপনি যে কোন অবস্থায় কিংবা পরিস্থিতিতে আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো করতে পারবেন, এই বিশ্বাস রাখা। এক্ষেত্রে অন্যদের সাহায্য হয়ত কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাবে আপনাকে, কিন্তু নিজের উপর বিশ্বাস কিন্তু ভেতর থেকেই আসতে হবে! আল্লাহর সাহায্য এবং নিজের উপর বিশ্বাস না থাকলে, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যমগুলোও আপনাকে উন্নত করতে পারবেনা। স্বনির্ভর হতে শিখুন, আল্লাহর উপর ভরসা করে এগিয়ে যান, তিনি বারাকাহ্‌ দিলে সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থাও আপনার অনুকূলে আসতে বাধ্য!
.
এই দু’আটি করতে পারেন, যা মূসা (আঃ) করেছিলেন আল্লাহর কাছে তাঁর কাজকে সহজ করে দেওয়ার জন্যঃ

“মূসা বলল, “হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রসারিত করে দাও। আমার কাজকে সহজ করে দাও। এবং আমার কথার জড়তা দূর করে দাও, যেন ওরা আমার কথা বুঝতে পারে“ ( কুরআন ২০ঃ ২৫-২৮)।

.

এগুলো শুধু কয়েকটি ধাপ মাত্র… মনে রাখতে হবে, আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত এর অনুশীলন প্রয়োজন। নিজের উপর ভরসা কিংবা ভালোবাসা না থাকলে, দুনিয়ার এই চরম কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া বড়ই যন্ত্রণাদায়ক হবে! পদে পদে নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হবে, পালিয়ে যেতে মন চাইবে! এই ধরনের মানুষগুলো সমাজ তো দূরে থাক, নিজের জন্যও কিছু করতে পারেনা।
.
শুধু আল্লাহর সাহায্য এবং আত্মবিশ্বাস পারে মানুষের ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে, জীবনকে সুখী-সুন্দর করে তুলতে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নিজেদের ভালোবাসার সামর্থ্য দিন, আমাদের আত্মশক্তিকে বাড়িয়ে দিন। আমীন।

ibanamedia@gmail.com

Review overview
1 COMMENT
  • Selim Al dinOctober 13, 2016

    sukra jajakAllah

POST A COMMENT