মানুষ, নাকি শুধুই ‘কাজের মানুষ’?

By Raihana Shams Islam   আমার খুব প্রিয় এক বন্ধু অনেকদিন থেকেই এ বিষয়ে কিছু লেখার জন্য আমাকে তাগিদ দিচ্ছিল। আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে ভীষণ জরুরী একটা বিষয়! কিন্তু এ নিয়ে লিখতে আমার বেশ অনেকখানি দ্বিধা ছিল এবং

1420480_818899348131538_1922878458_n

By Raihana Shams Islam

 

আমার খুব প্রিয় এক বন্ধু অনেকদিন থেকেই এ বিষয়ে কিছু লেখার জন্য আমাকে তাগিদ দিচ্ছিল। আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে ভীষণ জরুরী একটা বিষয়! কিন্তু এ নিয়ে লিখতে আমার বেশ অনেকখানি দ্বিধা ছিল এবং এখনও আছে। তার কারণ হলো আমি এই সমাজেরই অংশমাত্র, যা কিছু লিখব তার খানিকটা নিশ্চিতভাবে আমার নিজেরও লজ্জাজনক প্রতিফলন! তারপরেও মনে দ্বিধা রেখেই শেষমেশ লিখতে বসেছি।

আমাদের দেশে গৃহস্থালী ব্যবস্থাটা এমন যে ‘কাজের মানুষ’ রাখা আবশ্যক হয়ে পড়ে। আমাদের জীবন-প্রণালীতে সাহায্য ছাড়া চলা বেশ দুরূহ। যারা স্বদেশে ও বিদেশে উভয় জায়গাতেই সংসার করেছেন তারা জানেন, বাইরে নিজের হাতে অনেক কাজ করতে হলেও আবহাওয়া ও জীবনযাপনের ধরনের জন্য দেশের মতো সেটা অসম্ভব হয়ে ওঠে না। বরঞ্চ বেশ পরিশ্রম হলেও দেশের তুলনায় অনেকভাবেই সেটা স্বস্তিদায়ক। আমাদের দেশ ধুলা-ধূসরিত, ময়লা, গরম দেশ। প্রতিদিন এমনকি একবার করে বাড়িঘর পরিষ্কার করলেও যেন যথেষ্ট হয় না। ঘরে ঘরে মানুষের washing machine নেই। ঘরের কাছে বা দূরে supermarket এর আধিক্য নেই। ঘর পরিষ্কার, কাপড় কাচা, বাজার করার জন্য বাধ্য হয়েই আমাদের কাউকে রাখতে হয়। ‘কাজের মানুষ’ আমাদের দেশে দরকার। এটা হল বাস্তবতা।

তাহলে যাদের ছাড়া আমাদের চলে না তাদের মূল্য বোঝাটা আরও জরুরী, তাই নয় কী?
কিন্তু আমরা কেন জানি বুঝতে চাই না। আমাদের মত জনবহুল দরিদ্র দেশে শ্রম সস্তা, এটা একটা বড় কারণ। সস্তায় শ্রম কিনতে পারি বলে শ্রমের আসল মূল্য বুঝি না। যে মানুষটা সারাদিন গরমে ধোঁয়ায় কাহিল হয়ে আমাদের রান্না করে দিচ্ছেন বা ঘর পরিষ্কার করছেন, তাঁকে আমরা অতি সহজেই যেন অবহেলা করি। স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে তাঁর শ্রম পাই, সুতরাং শ্রমের প্রকৃত মর্যাদা আমরা উপেক্ষা করতে পারি। তারা যেন অনেকটাই আমাদের ময়লা ফেলার ঝুড়ির মতো! আমাদের প্রয়োজন-ফুরিয়ে-যাওয়া, পুরানো জিনিসপত্র মাঝে-মধ্যে তাদের বিলিয়ে দিয়ে আমরা জঞ্জালমুক্ত হই। কিন্তু এতটুকুতেই আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগতে থাকি, যেন কতো বড় ‘দান’ করলাম! আমাদের মনে একটা ধারণা গেঁথে বসেছে যে তাদের কাজে নিয়ে আমরা তাদের উপকার করছি। স্বল্প বেতনের কাজে তাদের পেটের দায় মিটছে হয়তো, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না আমাদের সংসারের কাজের দায়ও মিটছে একই সাথে। আমাদের যেটা ভালোভাবে বুঝতে হবে তা হলো গৃহকর্মীর সাথে আমাদের আদান-প্রদানটা সবসময় দুপক্ষের জন্যই লাভজনক একটা ব্যবস্থা।

গৃহকর্মীদের নিচু-নজরে দেখার দ্বিতীয় বড় কারণ হলো, আমাদের সমাজ শ্রেণিভেদকে অতি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আমরা, যাকে বলে, খুব “শ্রেণী সচেতন”। এই সমাজে সম্মান-শ্রদ্ধার মাপকাঠি হল ব্যক্তির জীবিকা। আমরা ঠিক করে নিয়েছি যে ডিগ্রীধারী এবং অর্থশালী যারা, তারাই শুধু সম্মানের যোগ্য এবং শ্রমিক-শ্রেণির একমাত্র কর্তব্য সেই সম্মান দেখানো। আমরা ‘সম্মানিত’রা খুব মহৎ হলে বড়জোর এদের করুণা ও দয়া দেখাতে পারি!
‘পেশাজীবী’ এবং ‘শ্রমজীবী’, এই ভাগ দুটি শিশুকালেই পরিবার, সমাজ ও বিদ্যালয়ে খুব ভালোভাবে শিখিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এর সাথে যে জরুরী শিক্ষাটি অবহেলিত থাকে, তা হলো এরা প্রত্যেকেই ‘জীবিকা’ নির্বাহ করছেন, বেঁচে থাকার নিমিত্তে প্রত্যেকেই কাজ করছেন এবং প্রত্যেকের সম্মিলিত কাজই সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে। প্রত্যেকের সৎ জীবিকাই তাই সম্মান ও শ্রদ্ধার হকদার। আর যারা ‘পেশা’ গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, তাঁদের থেকে আমাদের পার্থক্য তো শুধু জন্মের ভাগ্যে। উল্টো ভাগ্যে আমাদের স্থান হতে পারত ঠিক পাল্টাপাল্টি! এই সহজ সত্যটি মনে রাখলে আমরা আরও মানবিক হতে পারতাম।

আচরণে মানবিকতার অভাব থাকলেই বুঝি পাশবিকতা ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়। অল্পবয়সী গৃহকর্মীর প্রতি অস্বাভাবিক হিংস্রতা এই দেশে এত ব্যাপক হারে বিস্তৃত যে বিশ্বাস হয় না! পাশবিকতাই বা বলব কেন? পশুরা কি এই নিষ্ঠুরতা জানে?
ইস্ত্রির ছ্যাঁকা দেয়া, গরম পানি গায়ে ঢেলে দেয়া, মেরে ডাস্টবিনে ফেলে রাখা – এই বীভৎসতা আমরা কোথায় শিখলাম? একে কী আখ্যাই বা দেয়া যায়? নির্যাতনের যারা শিকার হয় তাদের মধ্যে অল্প কিছু “আদুরী”-ই শুধু সংবাদপত্রে আসে, বাকি আরও অগুনতি থেকে যায় সংবাদের অগোচরে। সংবাদে আসে না বলে তো আর আশেপাশের সমাজের অজানা নয়! অসহায় এই শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের উপর নির্যাতন সমাজ নীরব দর্শকের মতোই অবলোকন করে। এমনকি রাষ্ট্র পর্যন্ত এদের ব্যাপারে উদাসীন!
সেদিন পত্রিকায়[১] দেখছিলাম, গতবছরের সরকারী তালিকায় আটত্রিশটি ‘most hazardous jobs’ এর মধ্যে গৃহকর্মীদের উল্লেখ নেই! যেন এ হেন অত্যাচার কাজেরই অনুষঙ্গ! এধরনের নিষ্ঠুর বিকৃতি যে সমাজ-রাষ্ট্র সহ্য করে, তাকে কি আমাদের ‘সভ্য’ বলতে হবে?

এখানে কথা আসতে পারে যে সব কাহিনীরই দুই দিক থাকে। হ্যাঁ, থাকে ঠিকই। গৃহকর্তা বা কর্ত্রীর দিক। কিন্তু সেই দিকটির কথা আমি শুনতে রাজি তখনই, স্বাভাবিক মানবিক লেনদেন নিশ্চিত হবে যখন। কারণ কোনো কিছুই এই বিকৃতির অজুহাত হতে পারে না। হতে পারে যে কাজের মেয়েটি আপনার কথা শোনেনি কিংবা কোন কিছু চুরি করেছিল। এর বিহিত আছে। এর পরেও তাকে কাজে রাখতে চাইলে আপনি তাকে বোঝাবেন এবং চোখে চোখে রাখবেন, নয়তো পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে তাকে বিদায় করে দেবেন। অপরাধ গুরুতর হলে পুলিশেও দেওয়া যায়। কিন্তু কোনোমতেই নিজে অমানুষ হওয়ার লাইসেন্স পাওয়া যেতে পারে না।

শিশু বা বালিকা-বয়সী কাউকে গৃহকর্মে রাখার ব্যাপারে আমাদের নীতিগত আপত্তি থাকা উচিৎ। আপত্তি শুধুমাত্র ‘শিশুশ্রম’ বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নয়। আরও এই কারণে যে আমরা এদের সাথে নিজের সন্তানের তুলনায় কখনই সাম্য অবলম্বন করতে পারব না। প্রায়ই দেখা যায়, একটি আট-নয় বছরের স্কুলগামী বালিকাকে হয়ত আনা-নেয়া করছে আরেকটি নয়-দশ বছরের ‘কাজের মেয়ে’! এই দৃশ্য যে কী পরিমাণ হৃদয়-বিদারক তা বলার দরকার পড়ে না। এই মেয়েটি প্রতিদিন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে তারই সমান আরেকটি মেয়ের স্বাভাবিক অধিকারের চিত্র। স্কুল শেষে ছুটোছুটি করে খেলে ‘মালিকের’ মেয়ে আর সে ব্যাগ-বরদার হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে দেখে। বাসায় ফিরে বাড়ির মেয়েটি বই পড়ে, কার্টুন দেখে আর বাবা-মায়ের আদর নেয়; পাশেই ‘কাজের মেয়ে’ বইপত্র-ব্যাগ গুছিয়ে রাখে, বাসন মাজে আর আপনজনের কথা ভেবে চোখের পানি ফেলে। বাড়ির সবাই যদি তার সাথে ভালো ব্যবহারও করে তবুও তো এর চাইতে মর্মান্তিক আর কিছু হতে পারে না!

গৃহকর্মী আমাদের গৃহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের সাথে গৃহবাসীর সম্পর্কের ভিত্তি হল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। তাই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা সম্পর্কটিকে মানবিক ও কার্যকর রাখতে পারে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণেও অধীনস্থদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন। অপূর্ব সুন্দর একটা হাদিসের উল্লেখ শুধু করব।

“যখন তোমার ভৃত্য তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসে, যদি তুমি তাকে তোমার সাথে খেতে বসতে না বলতে পার, তবে অন্ততপক্ষে তাকে সেই খাবার থেকে এক-দুই মুঠো দিও; কারণ তোমার জন্য রাঁধতে গিয়ে সে চুলার গরমে কষ্ট পেয়েছে এবং তোমার খাবার যাতে সুস্বাদু হয় সেজন্য সে অনেক পরিশ্রম করেছে।” [২] 

এই একটি বাক্যে নিহিত আছে সবটুকু সারমর্ম। বাড়ির ‘কাজের মানুষ’টিকে নিয়ে একই খাবার টেবিলে খেতে বসতে আমাদের হয়তো আরও অনেক বছর সময় লাগবে, কিন্তু একজন মানুষের প্রাপ্য মর্যাদা তাকে দিতে যেন আমরা কার্পণ্য না করি।

 

[১] Daily Star, 03.09.14

[২] সহীহ বুখারী: ৭:৬৫:৩৭০


 Dr. Raihana Shams Islam
Associate Professor
Department of Physics
University of Rajshahi

readingroom@ibanaway.com

Review overview
2 COMMENTS
  • RangonOctober 1, 2014

    Miti Apu, I totally agree with your viewpoint. Very intelligent and heartwarming article. Keep up the good work.

  • সুমনOctober 29, 2014

    good

POST A COMMENT