নিজেকে ধ্বংস করার আগে সাবধান!

মূল লেখিকাঃ  Maryam Amirebrahimi [অনুবাদঃ Lamia Mohsin]   যখন আপনি একজন মুসলিম হয়ে আরেকজন মুসলিম কে ভুল করতে দেখেন তখন আপনার কি মনে হয়?   আপনি কি তাদের কে হেয় প্রতিপন্ন করেন? অথবা মনে করেন আপনি তাদের চেয়ে ভাল? নিজেকে

Nijeke-dhongsho

মূল লেখিকাঃ  Maryam Amirebrahimi
[অনুবাদঃ Lamia Mohsin]

 

যখন আপনি একজন মুসলিম হয়ে আরেকজন মুসলিম কে ভুল করতে দেখেন তখন আপনার কি মনে হয়?

 

আপনি কি তাদের কে হেয় প্রতিপন্ন করেন? অথবা মনে করেন আপনি তাদের চেয়ে ভাল? নিজেকে ধার্মিক ভাবা খুব একটা কঠিন কাজ না। আর আপনি যদি সমাজে নিজেকে ধার্মিক হিসেবে প্রদর্শন করে থাকেন, এমন সংকীর্ণ মানসিকতার  ফাঁদে পড়া খুবই সহজ।

 

এবার নিজেকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা যাক: আল্লাহ কি তাঁর সৎকর্মশীল ও ন্যায়পরায়ণ বান্দাদের তালিকায় আমাদের নামকে আদৌ ঠাই দিয়েছেন? নাকি মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ‘আল্লাহর প্রিয় বান্দা’র খেতাবে ভূষিত করে ফেলছি?
..

একটু যাচাই করে দেখুন…

আমি একবার আমার কলেজ ক্যাম্পাসে দাওয়াহ টেবিলে বসে ছিলাম। হঠাৎ একটি ছাত্রী এসে জিজ্ঞেস করল যে সে একটি কুরআন পেতে পারে কিনা। আমি সানন্দে তার হাতে বইটি তুলে দিতেই সে সরাসরি বলল, “আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”। প্রশ্নটা বেশ গম্ভীর বিষয়ে হওয়ায় বিশদ আলোচনার প্রয়োজন ছিল, তাই আমি পাশের খালি চেয়ারটাতে বসার আমন্ত্রণ জানালাম তাকে।
.
শুরুতেই সে আমার কাছে মিনতি করে ‘দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না’। সুবহানআল্লাহ (কি মহিমা আল্লাহর!)। না জানি দ্বিধাগ্রস্ত  মেয়েটি কতটা সাহস সঞ্চয় করে তার মনের কথাগুলো আমাকে বলতে এসেছে! আমি তাকে আশ্বাস দিলাম,  তার অনুরোধ আমি অবশ্যই রাখব।
.
তার গল্পের শুরুটা অনেকটা এরকমঃ

মেয়েটির কথামতে, অনেকদিন ধরেই সে একটি মুসলিম ছেলের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত । যদিও সে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের পরিকল্পনা করেছে, তার ভেতরে ভয়ানক অপরাধবোধ কাজ করে। সে যখন তার ছেলেবন্ধুর সাথে দেখা করে, সুখানুভূতির বদলে তার মধ্যে এক ধরনের পাপবোধ দেখা দেয়। বেশ বড় একটা পাপের ভাগীদার হচ্ছে বলে সে অনেক চেষ্টা করছে আত্মসংযম করার, কিন্তু এটাও সত্য যে তার পক্ষে সরে আসাটা খুব কঠিন। মেয়েটি তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন তো?’
.
মেয়েটি যখন কথা বলছিল আমি একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম: এটুকু অনুধাবন করতে পারছিলাম যে  মেয়েটির মনের মধ্যে প্রচণ্ড তোলপাড় হচ্ছে। বিপথগামী হওয়ার জন্য সে অসম্ভব অনুতপ্ত, এবং সৃষ্টিকর্তার আদেশ অমান্য করছে বলে নিজের উপরেই ঘেন্না হচ্ছে। এমন সম্পর্ক থেকে সরে আসা তার জন্য অত্যন্ত কঠিন তা জেনেও আল্লাহ তা’আলার ক্ষমা পাওয়ার জন্য তার কত নিঃসীম আকুতি!
.
তার তওবা করার ইচ্ছা এতোটাই তীব্র ছিল যে, সে আমার মত একটি অচেনা-অজানা, যাকে সে অতীতে কখনই দেখেনি, এমন একজন মেয়ের কাছে নিঃসঙ্কোচে, মন খুলে কথাগুলো বলেছে। আল্লাহ কি তাকে ক্ষমা করবেন? তিনি কি সত্যিই এমন গুনাহ ক্ষমা করতে পারে্ন? – আল্লাহর মার্জনা, তার ক্ষমা লাভের জন্য কতটা মরিয়া হলে কেউ এমনটা করতে পারে!
.
আমি তাকে বললাম, শোনো, আল্লাহ পরম করুণাময়, দয়ালু! কেউ যদি আল্লাহর পথে পুনরায় ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা করে, তিনি তার সকল অপরাধ, গুনাহ মাফ করে দেন। আমি তাকে আল্লাহর রহমতের কথা বললাম, বললাম যে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টির সেরা জীবের তওবা কত খুশি হয়ে কবুল করেন! তার কাছে আমাদের তওবার চেয়ে বড় কিছু নেই!
.
আমরা বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করলাম, কিভাবে অন্তর্যামী নাফসের সাথে সংগ্রামরত বান্দাদের দেখেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাদের ব্যাকুলতা, কাকুতি দেখে খুশী হন। আমরা পবিত্র হাদীস পড়লাম, যেখানে ঈশ্বর মানবজাতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং বলেছেনঃ

“হে আদম সন্তান, তুমি যতদিন পর্যন্ত আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে প্রার্থনা করবে, আমি তোমার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেব। হে আদম সন্তান, যদি তোমার পাপের সীমারেখা আকাশের মেঘকেও ছাড়িয়ে যায় এবং তবুও তুমি আমার মাগফিরাত কামনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব।  হে আদম সন্তান, আমাকে একমাত্র ইলাহ মান্য করে, এই পৃথিবীর সমান পাপের বোঝা নিয়েও যদি আমার কাছে আসো, আমার ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবে না। “-(আহমাদ)

কথাগুলো পড়ে মেয়েটি বেশ আবেগআপ্লুত হয়ে পড়ল । আমি তারপর তাকে একটি দু’আর কথা বললাম, যা দৃঢ় তাকওয়ার সঙ্গে সকালে বা সন্ধ্যায় পড়লে, দিন অথবা রাত্রে মৃত্যুবরণকারী যে কোন ব্যক্তি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
.
নবী ﷺ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে ক্ষমা চাওয়ার প্রধান দু’আটি (সায়্যিদুল ইস্তিগফার) শিখিয়েছিলেন নিম্নরূপেঃ
.

اللهم أنت ربي لا إله إلا أنت خلقتني وأنا عبدك وأنا على عهدك ووعدك ما استطعت أعوذ بك من شر ما صنعت أبوء لك بنعمتك علي وأبوء لك بذنبي فاغفر لي فإنه لا يغفر الذنوب إلا أنت
.
‘আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বী লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাক্বতানি ওয়া আনা আব্দুকা [ যদি পুরুষ হন] / আমাতুক [যদি মহিলা হন], ওয়া আনা আলা ‘আহদিকা ওয়া ওয়া’দিকা মাস্তাতা’তু। আ’ঊজু বিকা মিন শাররী মা সানা’তু, আবু’উ লাকা বি-নি`মাতিকা আলাইইয়া, ওয়া আবুঊ লাকা বি-যানবি, ফাগফিরলি, ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরু আয’যুনুবা ইল্লা আনতা’ ।
.
‘হে আল্লাহ! আপনি আমার রব! আপনি ব্যাতিত আর কোন উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার দাস, এবং আমি নিশ্চয়ই আপনার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ । আমার কৃত সকল পাপের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার প্রতি আপনার সকল নেয়ামত আপনার কাছে স্বীকার করছি, এবং আমার সব অপরাধওস্বীকার করে নিচ্ছি।  তাই আমাকে মাফ করে দিন, আপনি ছাড়া আর কেউ তো  গুনাহ মাফ করতে পারে না।‘ (বুখারী)
.
এবং অবশ্যই, আল্লাহর নিকটবর্তী হতে হলে, তার সান্নিধ্যে আসতে হলে, হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে, সহজ, সাবলীল ভাষায় তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
..

ভেবে দেখুন…

এবার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে ফিরে যাই । আপাতদৃষ্টিতে কাউকে কোন অন্যায় কাজ বা ভুল করতে দেখলে তার সম্পর্কে কেমন ধারণা হবে আপনার?
.
হ্যাঁ, সেই মুহূর্তে, সেই ব্যক্তিটিকে তার কর্মের কারণে আপনি ‘গুনাহগার’ হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করতে পারেন, কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে তারা নিজেদের কে সংশোধন করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তারা ষড়রিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে,এবং ক্রমাগত ঈশ্বরের কাছে আশ্রয় চাইছে । সম্ভবত কিছু মানুষের চোখে, এই ব্যক্তি একজন ‘পাপী’ (আমাদের মধ্যে কেই বা পাপী নয়?)। কিন্তু হয়তো আল্লাহর কাছে সেই সব বান্দারাই অধিক প্রিয় কারণ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতি মুহূর্তে সংগ্রাম করে যাচ্ছে নিজেদের ভেতরের দুর্বল সত্ত্বাকে দমন করতে। আমাদের মধ্যে যারা নিজেদেরকে ‘আদর্শ মুসলমান’ হিসেবে উপস্থাপন করি, আমাদের ‘ইসলামিক’ লেবাস বা চেতনাকে নিয়ে অহংকার করি , বা রাব্বুল আলামিনের (যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা) প্রিয় বান্দা হবার দাবী করি, আমাদের কি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ নয়? আমরা কি সত্যিই সংযুক্ত আছি ইসলামের সাথে? ইসলামের পথে?
.
দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না: যারা ন্যায়পরায়ণ থাকার এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পথনির্দেশনা অনুযায়ী চলার চেষ্টা করছেন, তারা অবশ্যই সম্মান আর প্রশংসার দাবীদার।
.
কিন্তু আমাদের মধ্যে যারা ভুল করে নিজেদেরকে সংশোধন করেছি, এরপর পাপের রাস্তা ছেড়ে পুণ্যের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি দেখে অহংকারবোধ করছি, এবং হয়তোবা নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় বেশি ‘পবিত্র’ বা ‘শুদ্ধ’ মনে করছি, আমাদের জন্যেই ওমরের (রাদিআল্লাহু ‘আনহু – আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হোন) একটি পরামর্শ,

অন্তিম হিসাবনিকাশ এর আগে নিজেকে শুধরে নাও!”

.
.
[Find the original article here – Check Yourself Before You Wreck Yourself]

ibanamedia@gmail.com

Review overview
NO COMMENTS

POST A COMMENT